ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

গ্যাস সংকটে দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে বিপিডিবির সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি

দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাস সংকটে দিনের পর দিন বন্ধ রয়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গ্যাস সংকটে দিনের পর দিন বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সংস্কার করে সক্ষমতা বাড়ানো হলেও গ্যাসের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। যে কারণে বিদ্যুৎ হাব হিসেবে পরিচিত ঘোড়াশালে এক রকম অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সাতটি ইউনিট রয়েছে। এগুলো গ্যাসভিত্তিক এবং বিভিন্ন সক্ষমতার। বিগত কয়েক বছরে সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির আধুনিকায়ন করে এর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রটি দেশের অন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে ব্যয় সাশ্রয়ীও। বর্তমানে কেন্দ্রটির সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু সেই সক্ষমতাও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে নেয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রর বাকি সক্ষমতাকে উৎপাদন উপযোগী করতে মেরামতকাজ চলছে।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি জুলাইয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি একদিনও চলেনি। গত জুনে চলেছে মাত্র চারদিন। ৫ জুন কেন্দ্রটি পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গতকাল পর্যন্ত কেন্দ্রটি আর চালু হয়নি। এর আগে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রটি মাত্র চারদিন চালু ছিল।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বেশ পুরনো। কেন্দ্রটি সংস্কার করে বিভিন্ন সময় এর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এজন্য বিপুল অর্থও ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এমনকি অন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে পিডিবিকে গ্যাসভিত্তিক দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ রাখার পেছনে ভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছেন বিপিডিবির দুজন কর্মকর্তা। তারা বণিক বার্তাকে বলেন, নরসিংদীতে বৃহৎ আকারের ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণ করেছে বিগত সরকার। সার কারখানা চালু রাখতে হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। কারণ এখানে গ্যাসের সরবরাহ লাইনের সক্ষমতা কম। যে কারণে দুটির কোনো একটি চালু রাখাই একমাত্র বিকল্প।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ঘোড়াশাল পাওয়ার প্লান্টের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে ৭৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনক্ষম এ অংশটিও চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঘোড়াশালে সার কারখানা রয়েছে। সেখানকার উৎপাদন চালু রাখতে গেলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর গ্যাস পায় না। যে কারণে কেন্দ্রটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হয়।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতা চালু রাখতে দৈনিক ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। মাসের দুই- একদিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চললে সর্বোচ্চ ৭৭-৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পায়। অন্যদিকে ঘোড়াশাল- পলাশ সার কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৭২ মিলিয়ন ঘনফুট। কারখানাটিতে সার উৎপাদনে প্রায় পূর্ণ চাহিদায় গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। এ কারণে সার কারখানায় গ্যাস দেয়া হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়।

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট সাতটি ইউনিট রয়েছে। সাতটি ইউনিটের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ১০৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের সক্ষমতা মোট ১১০ মেগাওয়াট। তৃতীয় ইউনিটের সক্ষমতা ২৬০, চতুর্থ ইউনিটের ১৮০, পঞ্চম ইউনিটের ১৯০ ও ষষ্ঠ ইউনিটের সক্ষমতা ৩৬৫ মেগাওয়াট। এসব ইউনিটের মধ্যে বেশ কয়েকটি সংস্কার করে মোট সক্ষমতা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে।

বিপিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, সাতটি ইউনিটের মধ্যে তিনটি ইউনিট সারা বছরই বন্ধ ছিল। দুটি ইউনিটের প্লান্ট ফ্যাক্টর যথাক্রমে ৪৯ ও ৫৯ শতাংশ (চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিট)। ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গড় উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি সাড়ে ৫ টাকার মতো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বহু পুরনো এবং বাংলাদেশে বিদ্যুৎ হাব হিসেবে পরিচিত। বৃহৎ কেন্দ্রটিতে বিদেশী বিনিয়োগও রয়েছে। দক্ষতা বিবেচনা ও ব্যয় সাশ্রয়ী হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পিডিবি এখানে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসের জোগান বিবেচনায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে পারে বিপিডিবি। বাকি সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরের বেশির ভাগ সময় অলস বসে থাকে।

আরও